নতুন করে হুথি হামলার প্রভাব

লোহিত সাগরে চলাচলে বেড়েছে জাহাজের বীমা খরচ

বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ রুট লোহিত সাগরে ফের হামলা শুরু করেছে হুথি বিদ্রোহীরা।

বৈশ্বিক সমুদ্র বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ রুট লোহিত সাগরে ফের হামলা শুরু করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। এতে এ পথে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা ঝুঁকি হুট করে বেড়ে গেছে, যার প্রভাব পড়েছে বীমা খরচে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বের বৃহত্তম ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার মার্শ ম্যাকলেনান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুসারে, লোহিত সাগর এড়িয়ে বিকল্প রুট হিসেবে আফ্রিকায় উপকূল ধরে চলাচল করছে অনেক জাহাজ। দুর্যোগপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এ রুট ধরে চলতে গিয়ে জাহাজ থেকে পণ্যবাহী কনটেইনার হারানোর ঘটনাও এখন ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে।

ইয়েমেনভিত্তিক হুথি বিদ্রোহীদের হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু বাব-আল-মানদেব প্রণালি। এ রুট হয়ে ভূমধ্য ও লোহিত সাগরকে যুক্তকারী সুয়েজ খালে প্রবেশ করে পণ্যবাহী জাহাজ। সাম্প্রতিক হামলা শুরু হয় গত রোববার। এদিন গ্রিসের স্টেম শিপিংয়ের মালিকানাধীন ম্যাজিক সিজ নামের ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ার হুথি বিদ্রোহীদের লক্ষ্যে পরিণত হয়। এর পরদিন আক্রান্ত হয় লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার এটারনিটি সি। এ দুটি ঘটনা নতুন করে সমুদ্র বাণিজ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর প্রভাব পড়েছে বীমা খাতে।

এফটির প্রতিবেদন অনুসারে, গত রোববার গ্রিস মালিকানাধীন কার্গো জাহাজে হামলার আগ পর্যন্ত আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যবর্তী এ জলপথে যুদ্ধসংক্রান্ত ঝুঁকির জন্য সর্বোচ্চ প্রিমিয়াম ছিল মোট জাহাজ মূল্যের দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু দুদিনের ব্যবধানে মঙ্গলবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ।

মার্শ ম্যাকলেনানের মেরিন অ্যান্ড কার্গো বিভাগের প্রধান মার্কাস বেকার বলেন, ‘প্রিমিয়াম বাড়ার অর্থ হচ্ছে, ১০ কোটি ডলারের একটি জাহাজের বীমা খরচ প্রতি যাত্রায় প্রায় ৩ লাখ ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ডলার পর্যন্ত।’

জাহাজ বীমা খরচ বাড়ার এতটা অস্বাভাবিক গতি আগে কখনো দেখেননি বলেও জানান মার্কাস বেকার। তিনি আরো উল্লেখ করেন, আগে হামলা শুরুর পর অনেক জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপের দীর্ঘ ঘুরপথ বেছে নিয়েছিল। এখনো সে খরুচে রুট বেছে নিতে পারে অনেক পণ্য পরিবহনকারী।

মার্কাস বেকার বলেন, ‘হঠাৎ করেই হুথিদের তৎপরতা দ্রুত বেড়ে গেছে। এখন জাহাজ মালিকরা যদি লোহিত সাগর ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তাহলে বীমা খরচ আরো বেড়ে যেতে পারে।’

এদিকে আটলান্টিক কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুসারে, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধাঞ্চল ঘোষণা করার পর জাহাজের কাঠামো ও কার্গো বীমার খরচ তীব্রভাবে বেড়েছে। আগে যেখানে যুদ্ধঝুঁকি বীমার হার ছিল জাহাজ মূল্যের দশমিক শূন্য ৫ থেকে দশমিক ১, তা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১-২ শতাংশ পর্যন্ত। বিশেষ করে একটি বড় কনটেইনার জাহাজ বা তার পণ্যের জন্য এ বীমা বাবদ অতিরিক্ত খরচ লাখ লাখ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে অনেক জাহাজের জন্য সুয়েজ রুট অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে।

এমনকি গত বছরের শুরুর দিকে কিছু বীমা সংস্থা এ রুটে চলাচলের ক্ষেত্রে বীমা পরিষেবা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তখন বীমা সুবিধা পেতে জাহাজ মালিকদের বিশেষ পলিসি বেছে নিতে হয়েছে বা সরকারি গ্যারান্টি প্রয়োজন হয়েছিল।

লোহিত সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চেকপয়েন্ট। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে হামলা নতুন করে বাড়লে তা শুধু বীমা খরচই বাড়াবে না, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য প্রবাহেও ব্যাঘাত ঘটাবে।

এদিকে ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিলের (ডব্লিউএসসি) বার্ষিক ‘কনটেইনারস লস্ট অ্যাট সি’ প্রতিবেদনে লোহিত সাগর রুট ব্যাহত হওয়ার ভিন্ন একটি প্রভাব ধরা পড়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে সমুদ্রে ৫৭৬টি কনটেইনার হারিয়েছে, যা ২০২৩ সালের ২২১টি থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। অবশ্য তা গত ১০ বছরের বার্ষিক গড় ১ হাজার ২৭৪টি থেকে অনেক কম। প্রতিবেদনে বলা হয়, কনটেইনার হারানোর এ বাড়তি ক্ষতির প্রধান কারণ হলো লোহিত সাগরসংক্রান্ত ব্যাঘাতের কারণে বিশ্ব বাণিজ্য রুটে ব্যাপক পরিবর্তন।

আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বৈরী আবহাওয়ার জন্য পরিচিত। এ পথে গত বছর ২০২৩ সালের তুলনায় জাহাজ চলাচল বেড়েছে ১৯১ শতাংশ। এখানেই ২০২৪ সালের মোট কনটেইনার ক্ষতির প্রায় ৩৫ শতাংশ বা প্রায় ২০০টি ঘটে।

ওয়ার্ল্ড শিপিং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও সিইও জো ক্রামেক বলেন, ‘ধারাবাহিক ক্ষতি-প্রতিরোধ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও লোহিত সাগর এড়াতে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে বিশ্ব বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে বাধ্য হচ্ছে শিপিং শিল্প। এতে পণ্যবাহী জাহাজকে পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক রুট অতিক্রম করতে হচ্ছে।’

২০২৩ সালে অক্টোবরে হামাসের এক হামলার পর গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসরায়েল। এর প্রতিক্রিয়ায় হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে। এসব হামলাকে গাজার যুদ্ধের প্রতিশোধ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে পরিচালিত বলে জানায় তারা। এ সময় তারা দাবি করে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে ১৩০টির বেশি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।

এ হামলার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে সুয়েজ রুটে চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তায়। ২০২৩ সালের মাঝামাঝিতে এমএসসিসহ বিশ্বের শীর্ষ ১৩টি শিপিং কোম্পানি লোহিত সাগর ও সুয়েজ রুটে চলাচল স্থগিত করে। গত বছরের জুন নাগাদ ড্রাই বাল্ক ক্যারিয়ারের সুয়েজ ব্যবহারের হার কমে ৮০ শতাংশ। একই সময়ে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে জাহাজ চলাচল বেড়ে যায়। এ পথ দিয়ে এশিয়া-ইউরোপ যাত্রা গড়ে ১০ দিন বাড়ে, যা পূর্বনির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ চেইনে চাপ সৃষ্টি করে।

আরও